তারিখ : ২২ জুলাই ২০১৯, সোমবার

সংবাদ শিরোনাম

বিস্তারিত বিষয়

বেনাপোলে দু’বাংলার ভাষা প্রেমীদের মিলন মেলা

বেনাপোলে দু’বাংলার ভাষা প্রেমীদের মিলন মেলা
[ভালুকা ডট কম : ২১ ফেব্রুয়ারী]
ভাষা দিবস মিলিয়ে দিল ‘এপার-ওপার’। বাঁশের বেড়া উপেক্ষা করে ভাষার দাবিতে আন্দোলনে শহীদদের সম্মিলিত শ্রদ্ধা জানাল ভারত-বাংলাদেশ। ভৌগলিক সীমারেখা ভুলে কেবল মাত্র ভাষার টানে দু’বাংলার মানুষ একই মঞ্চে গাইলেন বাংলার জয়গান। নেতারা হাতে হাত রেখে উর্ধ্বে তুলে ধরলেন বাংলাকে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন উপলক্ষে যশোরের বেনাপোল চেকপোস্ট নো-ম্যান্সল্যান্ডে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব একুশ মঞ্চে’ বৃহষ্পতিবার এ ভাবেই কাটালেন দুই বাংলার ‘বাংলা ভাষাভাষী’ মানুষ। একই আকাশ একই বাতাস, দু‘বাংলার মানুষের ভাষা এক। আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলি বলে বাংলাদেশের মানুষের জন্য আমাদের প্রাণ কাঁদে। তাই তো বারবার ছুটে আসি দুই দেশের বাঙালী বাংলাভাষী মানুষের পাশে।

সীমান্তের নো-ম্যান্সল্যান্ডে শহীদ বেদি ঢাকল ফুলের চাদরে। বেনাপোল চেকপোস্ট নো-ম্যান্সল্যান্ডে স্থাপিত অস্থায়ী শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মধ্য দিয়ে প্রতি বছরের মতো এবারো ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানানো হলো। মিষ্টি বিতরণ, আলোচনা আর গানে গানে মাতোয়ারা হলো দুই বাংলার একই আকাশ একই বাতাস। উভয় দেশের জনপ্রতিনিধিরা বলেন, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির কথা। এ অনুষ্ঠানকে ঘিরে জড়ো হয়েছিল হাজার হাজার ভাষাপ্রেমী মানুষ। নেতাদের কণ্ঠে ছিল ভবিষ্যতে আরো বড় করে এক মঞ্চে একুশসহ অন্যান্য অনুষ্ঠান উদযাপনের প্রত্যাশা। উভয় দেশের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো শত:স্ফুর্তভাবে অংশ নেয় এ অনুষ্ঠানে। দু‘দেশের জাতীয় পতাকা, নানা রং এর ফেস্টুন, ব্যানার, প্লেকার্ড, আর ফুল দিয়ে বর্নিল সাজে সাজানো হয় নোম্যান্সল্যান্ড এলাকা। দু‘বাংলার মানুষের এ মিলন মেলায় উভয় দেশের সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদের মধ্যে উৎসাহের সৃষ্টি হয়। প্রতি বছরই দুই বাংলার সীমান্তবর্তী এ অংশের বাসিন্দারা এক সাথে মিলিত হয়ে দিবসটি পালন করেন। তখন দুই দেশের সীমান্তের মধ্যবর্তী ওই স্থানে আবেগাপত পরিবেশের সৃষ্টি হয়। একে অপরকে আলিঙ্গন করে সকল ভেদাভেদ যেন ভুলে যায় কিছু সময়ের জন্য। ফুলের মালা ও জাতীয় পতাকা বিনিময় করে উভয় দেশের আবেগপ্রবণ অনেক মানুষ বাঙালীর নাড়ির টানে একজন অপরজনকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন। দুই বাংলার মানুষের মাঝে বসে এক মিলন মেলা। এ সময় পেট্রাপোল ও বেনাপোল চেকপোস্টে ঢল নামে হাজার হাজার মানুষের। ক্ষনিকের জন্য হলেও স্তব্ধ হয়ে যায় আন্তর্জাতিক সীমারেখা।

সকাল ১০ টায় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের খাদ্য ও সরবরাহ মন্ত্রী শ্রী জ্যোতি প্রিয় মল্লিক, লোক সভার বনগাঁ অঞ্চলের সাংসদ মমতা ঠাকুর, বিধায়ক বিশ্বজিৎ দাস, সুরজিত কুমার বিশ্বাস, গাইঘাটা বিধায়ক শ্রী পূলিন বিহারী ও বনগাঁ পৌর মেয়র শংকর  আঢ্য ও উত্তর ২৪ পরগঁনার জেলা সভাধিপতি শ্রীমতি বীনা মন্ডল’র নেতৃত্বে ভারত থেকে আসা শতশত বাংলাভাষী মানুষ বাংলাদেশীদের ফুলের পাঁপড়ী ছিটিয়ে ও মিস্টি দিয়ে বরণ করে নেয় একে অপরকে। নো-মান্সল্যান্ডে অস্থায়ী শহীদ বেদীতে প্রথম ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান উভয় দেশের জনপ্রতিনিধিসহ সরকারী কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন, স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্রাচার্য এমপি, সংসদ সদস্য আলহাজ্ব শেখ আফিল উদ্দিন, জেলা প্রশাসক আব্দুল আওয়াল, বেনাপোল কাষ্টমস্ কমিশনার বেলাল হোসাইন, শার্শা উপজেলা চেয়ারম্যান সিরাজুল হক মঞ্জু, শিক্ষা বিষায়ক সম্পাদক আসিফ উদ-দৌলা সরদার অলোক, বেনাপোল সিএন্ডএফ এ্যাসোসিয়েশন এর সভাপতি মফিজুর রহমান স্বজন, সাধারন সম্পাদক এমদাদুল হক লতা, বেনাপোল পোর্ট থানা অফিসার্স ইনচার্জ আবু সালেহ মাসুদ করিম, শার্শা থানা অফিসার্স ইনচার্জ এম মশিউর রহমান, ইমিগ্রেশন ওসি তরিকুল ইসলাম প্রমুখ।

এ সময় উভয় দেশের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো অংশ নেয় এ অনুষ্ঠানে। ভাষা দিবসের মিলন মেলায় বিজিবি বিএসএফকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায়। এর পর দু’দেশের জাতীয় পতাকা উড়িয়ে হাজার হাজার ভাষাপ্রেমী মানুষ দিবসটি উদযাপন করে যৌথভাবে। এ সময় ভাষার টানে বাঙালির বাঁধন হারা আবেগের কাছে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায় দু’বাংলার মানুষ। এর মধ্য দিয়ে বোঝা গেল রফিক, শফিক, বরকত ও সালামের তরতাজা রক্ত বৃথা যায়নি। ভাষার আকর্ষণ ও বাঙালির নাড়ির টান যে কতটা আত্মিক ও প্রীতিময় হতে পারে তাও বুঝিয়ে দিল মহান একুশে ফেব্রুয়ারি। সেই সঙ্গে এপার-ওপার দুই বাংলার গণমানুষের ঢল ফের প্রমাণ করে দিলো দেশ ভাগ হলেও ভাগ হয়নি ভাষার। উভয় দেশের মধ্যকার সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তি এখনো যে অটুট রয়েছে তাও বোঝা গেল অনুষ্ঠানে উপস্থিত দুই বাংলার অতিথিদের বক্তৃতায়। এরপর ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব একুশ মঞ্চে’ উঠেন দু‘দেশের নেতৃবৃন্দ।

আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি আওয়ামীলীগের সভাপতি মন্ডলীর সদস্য ও স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী পীযুষ কান্তি ভট্রাচার্য  বলেন, ৫২ এর ভাষা আন্দোলন আমাদের অধিকার বোধের জম্ম দিয়েছিল। রক্তের বিনিময়ে রাস্ট্রভাষার যে অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা বিশ্বে বিরল। অন্য জাতির এই গৌরব নেই। সেই চেতনার ধারাবাহিকতায় আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ এ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অগনিত মানুষের অংশ গ্রহনে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। আর এই স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের জনগণ ও সরকার আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের সাথে আমাদের আত্মার সম্পর্ক, নাড়ীর সম্পর্ক। এদেশের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতন্ত্র বিকশিত হতে শুরু করেছে। ভাষা ও ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ আমাদের দুই দেশের মধ্যে উপস্থিত সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের ভিতকে আরো শক্ত করবে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের খাদ্য ও সরবরাহ মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক বলেন, আপনারা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছেন। স্বাধীনতার জন্য অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। ভাষা আর স্বাধীনতার জন্য এত ত্যাগের নজির পৃথিবীতে অন্য কারোর নেই। এ জন্য আপনারা গর্বিত জাতি। ভাষার টানে আমরা বাংলাদেশে ছুটে এসেছি একুশ উদযাপন করতে। দু’বাংলার মানুষ একসাথে মাতৃভাষা দিবস পালন করছে দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। আপনারা ভাল থাকলে আমরাও ভাল থাকবো। দু’বাংলার মানুষ আমাদের খুব কাছের মানুষ। আমাদের পূর্ব পুরুষেরা এপার বাংলারই মানুষ ছিল। দু’বাংলার মানুষের মিলন মেলার মধ্য দিয়ে দু’দেশের বন্ধুত্ব আরো সুদৃঢ় হবে। আমার এসেছি অন্তরের টানে। বার বার ছুটে আসি। দেশ বিভক্তি হলেও ভাষার পরিবর্তন হয়নি। আমরা ওপারে থাকলেও শহীদ সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ সকল ভাষা সৈনিকের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল। তিনি আরো বলেন, সীমান্তের গেটে ভাষা শহীদদের ছবি টাঙিয়ে দেওয়া হবে। বনগাঁতে শহীদদের স্মরণে ব্লাড ব্যাংক তৈরি করা হবে।  

মঞ্চে একুশের কবিতা আবৃতি, ছড়া, গীতিনাট্য, আলোচনা আর সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের ভাষা সৈনিক সামছুল হুদা, ভাষা আন্দোলন গবেষনা কেন্দ্রের পরিচালক এস আর মাহবুব, আবৃত্তি শিল্পী শাহাদত হোসেন নিপুন ও জিবাংলা খ্যত সঙ্গীত শিল্পী মইনুল আহসান নোবেল। ভাষা শহীদদের স্মরনে দু’বাংলার মানুষের সম্প্রতি আর ভালোবাসার বাধনকে আরো সুদৃঢ় করার প্রত্যয় নিয়ে শেষ হয় ভাষা প্রেমিদের মিলন মেলা। সীমান্ত টপকে যাতে কেউ অবৈধভাবে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য বিজিবি ও বিএসএফ বাঁশের বেস্টনি দিয়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলে।

উল্লেখ্য, ২০০২ সাল থেকে দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোল চেকপোস্টের জিরো পয়েন্টে মাতৃভাষা দিবস পালন করে আসছে দু’বাংলার মানুষ। প্রতিবার দুটি মঞ্চ করা হলেও এবার একই মঞ্চে অনুষ্ঠান করা হয়।এছাড়া আয়োজনস্থলে ভাষা সৈনিক সব্যসাচী কবি শামসুল হক চত্বর, বর্ণমালা গ্যালারি, বইমেলা ও রক্তদান কর্মসূচি রয়েছে। যা ভাষা উৎসবকে প্রাণবন্ত এবং দুই বাংলার মানুষকে আরও বেশি অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করে। # 





সতর্কীকরণ

সতর্কীকরণ : কলাম বিভাগটি ব্যাক্তির স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য,আমরা বিশ্বাস করি ব্যাক্তির কথা বলার পূর্ণ স্বাধীনতায় তাই কলাম বিভাগের লিখা সমূহ এবং যে কোন প্রকারের মন্তব্যর জন্য ভালুকা ডট কম কর্তৃপক্ষ দায়ী নয় । প্রত্যেক ব্যাক্তি তার নিজ দ্বায়ীত্বে তার মন্তব্য বা লিখা প্রকাশের জন্য কর্তৃপক্ষ কে দিচ্ছেন ।

কমেন্ট

বিনোদন বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

অনলাইন জরিপ

  • ভালুকা ডট কম এর নতুন কাজ আপনার কাছে ভাল লাগছে ?
    ভোট দিয়েছেন ৫৮৩ জন
    হ্যাঁ
    না
    মন্তব্য নেই